পদ্মা সেতুতে ফেরির ‘ধাক্কায়’ ষড়যন্ত্র দেখছেন নৌ প্রতিমন্ত্রী

প্রকাশিত: ০৪:২৬ পি এম , ৩১ আগস্ট ২০২১

খালিদ মাহমুদ বলেন, ‘আমার কাছে মনে হচ্ছে, এটা আমরা ব্যক্তিগত উপলব্ধি, আজকের ঘটনায় মধ্যে আমি গভীর ষড়যন্ত্র খুঁজে পাচ্ছি। এটার পেছনে কোনো...আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে আমি বলেছি, সিনিয়র মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও আজকে নির্দেশনা দিয়েছেন। এটা গভীরভাবে তদন্ত করতে হবে এবং এটা অবশ্যই উদঘাটন করতে হবে।’

পদ্মা সেতুর স্প্যানে ফেরি বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীরের ‘ধাক্কার’ ঘটনায় গভীর ষড়যন্ত্র দেখছেন নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। তদন্তের মাধ্যমে এ ঘটনার সত্য উদঘাটন করা হবে বলেও জানান তিনি।

সচিবালয়ে মঙ্গলবার সাংবাদিকদেরকে প্রতিমন্ত্রী এ কথা জানান।

পদ্মা সেতুর ২ ও ৩ নম্বর পিলারের মাঝখানে ‘ওয়ান বি’ স্প্যানে মঙ্গলবার সকালে ফেরি বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীরের ধাক্কা দেয়ার খবর প্রকাশ করে কয়েকটি সংবাদমাধ্যম। এতে দাবি করা হয়, আঘাতে ফেরির ফ্ল্যাগ স্ট্যান্ড বা মাস্তুল ভেঙে গেছে।

তবে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) কর্মকর্তারা জানান, সেতুতে ফেরির ফ্ল্যাগ স্ট্যান্ডের কোনো ধরনের স্পর্শ বা ধাক্কা লাগেনি। এটি নিয়ন্ত্রণ করা যায়। সেতুর স্প্যানের স্পর্শ লাগার আগেই স্ট্যান্ডটি নুইয়ে ফেলা হয়েছিল। একই বক্তব্য দিয়েছে সেতু কর্তৃপক্ষও।

এ বিষয়ে নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘সকাল বেলা এই ঘটনা আমরা দেখলাম, জাহাজ গেল, আবার ওখানে গিয়ে কোনো চিহ্ন পাওয়া যাচ্ছে না। আবার ভিডিওতে দেখছি (মাস্তুল) বাড়ি খেয়ে পড়ে গেল। বলা হচ্ছে ওটা লোহার, লোহার হলে তো পড়ে যাবে, বেঁকে যাবে এবং ঘষা খাবে, কিন্তু ঘষার কোনো চিহ্ন নেই। এই সংবাদগুলো কেন আসছে, এটাও একটা তদন্ত হওয়া দরকার। আমরা কথা ভুল হলে আমি খুশি হবো যে, এটার মধ্যে কোনো ষড়যন্ত্র নেই।’

উচ্চতা অনুযায়ী স্প্যানে কোনো নৌযানের ধাক্কা লাগার কথা নয়- এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘এটা তো আমাদেরও প্রশ্ন। পদ্মা সেতুর যে নকশা করা হয়েছে, সেই নকশা অনুযায়ী যে উচ্চতা থাকার কথা, সেখানে কোনোভাবেই ওপরের স্প্যানে আঘাত লাগার কথা নয়। আজকে এটা হয়েছে, কেন হয়েছে? আমরা বলেছি, এটার নিবিড় তদন্ত করতে হবে। এই ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত... এই ঘটনার পেছনে অন্য কিছু উদ্দেশ্য আছে কি না সেটা আমাদের ভাবিয়ে তুলছে।’

এ ঘটনায় ষড়যন্ত্রের গন্ধও পাচ্ছেন বলে জানালেন খালিদ মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘আমার কাছে মনে হচ্ছে, এটা আমরা ব্যক্তিগত উপলব্ধি, আজকের ঘটনায় মধ্যে আমি গভীর ষড়যন্ত্র খুঁজে পাচ্ছি। এটার পেছনে কোনো...আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে আমি বলেছি, সিনিয়র মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও আজকে নির্দেশনা দিয়েছেন। এটা গভীরভাবে তদন্ত করতে হবে এবং এটা অবশ্যই উদঘাটন করতে হবে।’

পদ্মা সেতু নিয়ে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী। আর তাই সেতুর নিরাপত্তার কথা ভেবে ১৩ দিন ফেরি চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে মানুষের অনেক ভোগান্তি হচ্ছে বলেও স্বীকার করেন খালিদ মাহমুদ।

তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের অপরাধী ভাবছি। এখন তো মনে হচ্ছে এটা পদ্মা সেতুর আঘাত না, আঘাত আমাদেরকেই করা হচ্ছে। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ইতোমধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন, তিনি তদন্ত করার নির্দেশনা দিয়েছেন। আমরা চাই এটার সঠিক তদন্ত হোক। অপরাধী যেই হোক, যারা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত সেগুলো তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসুক।’

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘সেতু কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে স্প্যানের কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তবে ভিডিও দেখে মনে হয়েছে আঘাত লেগেছে, সেখানে ধাক্কা লেগেছে। তারা স্থান পরিদর্শন করে দেখেছেন কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই। এগুলো তদন্ত করলে সব বেরিয়ে আসবে।’

এর আগে পদ্মা সেতুতে আঘাতের ঘটনা তদন্তে কী পাওয়া গেছে জানতে চাওয়া হয় খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর কাছে। তিনি জানান, তদন্তের অসৎ উদ্দেশ্যের প্রমাণ না মিললেও ফেরি সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতা ও দুর্বলতা পাওয়া গেছে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘মাস্টার-সুকানিসহ অনেককেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তাদের মেডিক্যাল পরীক্ষাও করা হয়েছে। স্বাস্থ্যগত কোনো ধরনের ত্রুটি পাওয়া যায়নি। ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করে যে ধরনের কথা বলছি, সেই ধরনের কোনো বিষয়ও উদঘাটন করা যায়নি। তাদের কোনো অসৎ উদ্দেশ্য পাওয়া যায়নি। সেগুলো দুর্ঘটনাই ছিল। আমি বলেছিলাম, উদাসীনতা ও দুর্বলতা আছে। দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে।’

পদ্মার পানিপৃষ্ঠ থেকে সেতু পর্যন্ত ১৮ মিটার উচ্চতা রাখার জন্য বিআইডব্লিউটিএ-এর পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘পদ্মা সেতুর কর্তৃপক্ষ ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, পয়েন্ট ৫ মিটার অতিরিক্ত উচ্চতা রেখেছিল।’

পদ্মা সেতু নির্মাণ কৌশল তুলে ধরে খালিদ মাহমুদ বলেন, ‘এই ধরনের ধাক্কা দিয়ে পদ্মা সেতুর কোনো ক্ষতি হবে না। ক্ষতি হবে আমাদের মনের। আজকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে বলছে, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় বিশ্বাস ঘাতকতার জায়গায় চলে গেছে। এটা কেন বলতেছে, এটা তাদের অনুভূতির জায়গায় চলে গেছে। এটাই হচ্ছে আমাদের বড় কষ্ট।’

ঘাট স্থানান্তরের বিষয়ে জানতে চাইলে নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘পদ্মা সেতু চালুর পর মাঝিরকান্দি ঘাট বিকল্প হতে পারে। এসব ঘটনার পর আমাদের মাস্টারদের মধ্যেও ভীতি তৈরি হয়েছে। আবার যদি কোনো ঘটনা ঘটে যায়, কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।’

মাঝিরকান্দি ঘাট প্রস্তুত রাখা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সেখানে নাব্যতা সংকট দেখা দিয়েছে। নাব্যতা ও রাস্তার বিষয়টি ক্লিয়ার হলে হয়তো আমরা হালকা যানবাহন আপাতত পারাপার করতে পারব। কারণ এখানে ইয়ার্ড করার কোনো সুযোগ নেই। ভবিষ্যতে পদ্মা সেতু কর্তৃপক্ষ একটা জায়গা দেবে ইয়ার্ড করার জন্য।’

এই রুটে চলাচলরত ফেরিগুলোর ফিটনেস নিয়ে প্রশ্ন রাখা হলে তিনি বলেন, ‘গত ১২ বছরে আমরা ২৩টি ফেরি যুক্ত করেছি। আমাদের আরও ফেরি প্রয়োজন। মানুষের চাহিদার জন্য আমাদের ঝুঁকি নিয়ে এগুলো চালাতে হয়, কিন্তু ফেরিগুলো রেগুলার মেইনটেনেন্স করা হয়। বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর গতকাল ডকইয়ার্ড থেকে পানিতে নেমেছে।’


সর্বশেষ

জনপ্রিয় খবর